Tesla : প্রযুক্তির আশীর্বাদে আজকাল স্টিয়ারিংয়ে হাত না রাখলেও নাকি চলে! কিন্তু সেই ‘স্বয়ংক্রিয়’ রথ যদি সোজা কারও বাড়ির দেওয়াল ভেঙে ড্রয়িংরুমে ঢুকে প্রাণ কাড়ে, তখন দায় কার? গাড়ির, না চালকের?
টেক্সাসের হিউস্টনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এবার এমনই এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা সংস্থা টেসলা (Tesla)। আর ৭৬ বছরের এক বৃদ্ধার প্রাণ কাড়ার দায়ে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলায় (Manslaughter) ফাঁসলেন খোদ টেসলা চালক মাইকেল ডেভিড বাটলার।
Tesla : গানের প্লে-লিস্ট বদলাতে গিয়েই দুর্ঘটনা?
ঘটনাটা গত ১৯ জুনের।
‘ডোরড্যাশ’-এর ডেলিভারি দিতে যাচ্ছিলেন ৪৪ বছরের বাটলার। বাহন? ঝাঁ চকচকে (Tesla)টেসলা ‘মডেল ৩’।
চালকের দাবি, গাড়ি নাকি চলছিল ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ (FSD) মোডে। ডেলিভারির ফাঁকে টেসলার টাচস্ক্রিনে একটু গানের প্লে-লিস্ট বদলাতে গিয়েছিলেন তিনি। আর ঠিক সেই সময়েই নাকি তাঁর ‘ব্ল্যাকআউট’ বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়!
যখন হুঁশ ফিরল, ততক্ষণে তাঁর টেসলা সটান ঢুকে গিয়েছে টেক্সাসের ক্যাটি এলাকার বাসিন্দা মার্থা আভিলা নামের এক বৃদ্ধার বাড়িতে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে মৃত্যু হয় মার্থার।
পুলিশ ও প্যারামেডিকদের কাছে বাটলারের সাফাই, “আমার কী দোষ! গাড়ি তো অটোপাইলট মোডে ছিল!”

পুলিশের তদন্তে উঠে এল কী?
কিন্তু পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়। গ্রেফতারি পরোয়ানার নথি বলছে অন্য কথা।
গতির উড়ান
দুর্ঘটনার আগে গাড়ির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৭৩ মাইল। অর্থাৎ, ওই রাস্তার নির্ধারিত আইনি গতিসীমার দ্বিগুণেরও বেশি!
ব্রেক কোথায়?
আশ্চর্যের বিষয় হল, দুর্ঘটনার ঠিক এক মিনিট আগে পর্যন্ত গাড়ির ব্রেক প্যাডেলটি একবারও ছোঁয়া হয়নি।
নেশা নাকি ভান?
ডাক্তারি পরীক্ষায় বাটলারের শরীরে অ্যালকোহল বা কোনও মাদকের চিহ্ন মেলেনি। চালক নিজেও জানিয়েছেন যে তিনি অসুস্থ ছিলেন না। তাহলে হঠাৎ ওই ‘অজ্ঞান’ হওয়ার তত্ত্ব এল কোথা থেকে?
আসরে খোদ ইলন মাস্ক
নিজের সংস্থার ঘাড়ে দোষ চাপতে দেখেই ময়দানে নেমেছেন টেসলা-কর্ণধার খোদ ইলন মাস্ক।
তাঁর কড়া দাবি, ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ মোডে থাকলে গাড়ি(Tesla) পাড়ার গলিতে একেবারে সুবোধ বালকের মতো ধীরগতিতেই চলে।
টেসলার এক সফটওয়্যার কর্তার তো সোজা অভিযোগ— চালক নিজেই অ্যাক্সিলারেটরে সজোরে চাপ দিয়ে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমটিকে ‘ম্যানুয়াল ওভাররাইড’ করেছিলেন।
অর্থাৎ, অটোপাইলটের নাম করে আসলে গতির নেশায় বুঁদ ছিলেন চালক নিজেই।
জামিন মিললেও কড়া শর্ত
আপাতত দেড় লক্ষ ডলারের (প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা) বন্ডে জামিন পেয়েছেন বাটলার।
তবে শর্তসাপেক্ষে তাঁর পায়ে এখন সর্বদা শোভা পাবে একটি মনিটর (অ্যাঙ্কেল মনিটর)।
আর স্টিয়ারিং ধরা তো দূর অস্ত, গাড়ি চালানোর ওপর জারি হয়েছে কড়া নিষেধাজ্ঞা।
NHTSA-র নজরে টেসলার অটোপাইলট
তবে টেসলা(Tesla) যতই দায় এড়ানোর চেষ্টা করুক, আমেরিকার ‘ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (NHTSA) কিন্তু সহজে ছাড়ছে না।
২০১৬ সাল থেকে টেসলার(Tesla) এই তথাকথিত ‘উন্নত চালক সহায়তা সিস্টেম’-এর সঙ্গে জড়িত প্রায় ৫০টি দুর্ঘটনার তদন্ত করছে তারা, যেখানে ইতিমধ্যেই বলি হয়েছেন দুই ডজনেরও বেশি মানুষ।
নিহতের পরিবারের মামলা
নিহত মার্থার পরিবার ইতিমধ্যেই টেসলার(Tesla) বিরুদ্ধে চরম গাফিলতির অভিযোগ তুলে মামলা ঠুকেছে।
তাঁদের দাবি, টেসলার(Tesla) এই ‘ত্রুটিপূর্ণ’ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণেই অকালে প্রাণ গেল বৃদ্ধার।
প্রযুক্তির এই ইঁদুরদৌড়ে গাড়ি হয়তো স্বয়ংক্রিয় হতে পারে, কিন্তু গাফিলতির দায় যে কোনো যন্ত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে সহজে পার পাওয়া যায় না, টেক্সাসের এই ঘটনাই হয়তো তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
কলমে : সুনীপম মহাকুল
