৩০ জুন ২০২৬ : শোষিত, বঞ্চিত ও অত্যাচারিত মানুষের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক লড়াইয়ের দিন ৩০ জুন। মঙ্গলবার, ১৭১তম হুল দিবস উপলক্ষে গোটা ঝাড়গ্রাম জেলা জুড়ে প্রবল আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হল সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর শহিদদের।
সিধো, কানহু, চাঁদ, ভৈরব থেকে শুরু করে ফুলো ও ঝানো— ব্রিটিশ শক্তি এবং দেশীয় জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে তাঁদের সেই আপসহীন লড়াই এবং আত্মত্যাগের ইতিহাসকে কুর্নিশ জানাতে দিনভর জেলার নানা প্রান্তে আয়োজিত হল বর্ণাঢ্য পদযাত্রা ও স্মরণসভা।
জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রী ও বিধায়করা এই দিনটিতে শহিদ বেদিতে মাল্যদান করে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

১৭১তম হুল দিবস : জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ হুল দিবস উদ্যাপন
ঝাড়গ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় ঝাড়গ্রাম মহকুমা কার্যালয়ে এ দিন এক বিশেষ হুল দিবস উদ্যাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সেই সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়গ্রামের বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউ।
ঐতিহাসিক এই দিনে সিধো-কানহু-সহ সকল হুল বীর শহিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, মাতৃভূমি ও অধিকার রক্ষার ওই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে তাঁদের চরম আত্মত্যাগ এবং অদম্য সাহস চিরকাল সাধারণ মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
১৭১তম হুল দিবস : ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রবন্ধ ও অঙ্কন প্রতিযোগিতা
নতুন প্রজন্মের কাছে এই বিদ্রোহের গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরতে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রবন্ধ রচনা ও অঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান নেতা রাজেশ মাহাতো।
তিনি বলেন, যে সমস্ত পূর্বজরা সাধারণ মানুষের জন্য লড়াই করেছিলেন এবং জল, জঙ্গল ও জমির অধিকার সুরক্ষিত করতে অকাতরে নিজেদের জীবন বলিদান দিয়েছিলেন, তাঁদের সেই বীরগাথা ও ‘উলগুলান’-কে আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার দিন।
ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ইতিহাস তুলে ধরার এই আয়োজনের জন্য তিনি জেলা প্রশাসনকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।

জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পদযাত্রা ও স্মরণসভা
জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকাতেও এ দিন নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়।
বালিগেড়িয়া খেরওয়াল ডাংহে ক্লাবের আয়োজনে ১৭১তম হুল দিবসের পদযাত্রা ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সিধো-কানহু, চাঁদ-ভৈরব এবং ফুলো-ঝানোর নেতৃত্বকে স্মরণ করেন রাজ্যের মন্ত্রী অমিয় কিস্কু।
তিনি জানান, মাতৃভূমির সম্মান রক্ষায় বীর শহিদদের এই সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার আদর্শ আগামী দিনের পথচলায় সকলের কাছে বড় প্রেরণা।

১৭১তম হুল দিবস : বিনপুরের বিধায়ক প্রণত টুডুর দিনভর কর্মসূচি
পিছিয়ে ছিলেন না বিনপুরের বিধায়ক ডাক্তার প্রণত টুডুও।
সকাল থেকেই আদিবাসী গৌরব ও আত্মপরিচয়ের এই দিনটি উদ্যাপনে তিনি জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়ান।
তাঁর দিনভর ঠাসা কর্মসূচি শুরু হয় সকাল সাড়ে সাতটায় গিধনি মডেল স্কুল থেকে।
এরপর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি একে একে পরিহাটি, শিলদা স্কুল মাঠ, দুপুরে মুকুটমণিপুর একলব্য মডেল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এবং বিকেলে গোয়ালতোড়ের দয়াহাটি এলাকায় আয়োজিত হুল দিবসের কর্মসূচিতে যোগ দেন।

একতার বার্তায় মুখর জঙ্গলমহল
সব মিলিয়ে, সমস্ত রাজনৈতিক ভেদাভেদ দূরে সরিয়ে রেখে আদিবাসী জনজাতির এই মহান আত্মত্যাগের ইতিহাসকে পাথেয় করে একতার সুরেই গোটা জঙ্গলমহল জুড়ে পালিত হল এবারের হুল দিবস।
কলমে : সুনীপম মহাকুল, ঝাড়গ্রাম
