নয়াদিল্লি, ২৭ জুন: খেলার মাঠে সৌজন্যের করমর্দন উধাও, কূটনৈতিক মঞ্চে প্রতিদিন উড়ে আসছে পরমাণু যুদ্ধের কড়া হুমকি। অথচ সেই রাওয়ালপিন্ডির সেনাকর্তা এবং ইসলামাবাদের রাজনীতিকরাই নাকি তলে তলে জলের(Water) আশায় নয়াদিল্লির পা ধরছেন!
ব্যাঙ্কক ও কলম্বোয় গোপন বৈঠকের দাবি
রয়টার্স সূত্রে খবর, পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার জেরে ভারত দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার ঠিক এক বছরের মাথায় অতি গোপনে ব্যাঙ্কক ও কলম্বোয় বৈঠকে বসেছিলেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
ব্যাঙ্ককে হয়েছে প্রথম স্তরের (ট্র্যাক-ওয়ান) আলোচনা, আর কলম্বোয় বসেছিল দ্বিতীয় স্তরের (ট্র্যাক-টু) বৈঠক। দুই দেশের অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক, প্রাক্তন সেনাকর্তা ও কৌশলগত বিশ্লেষকদের ওই গোপন উপস্থিতির খবর সামনে আসতেই সাউথ ব্লকের অন্দরে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
তবে কি যুদ্ধের ভয়ে পিছু হঠল মোদী সরকার, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে দিল্লির কোনও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক চাল— তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

পহেলগাঁও হামলা থেকে অপারেশন সিঁদুর
ঘটনার সূত্রপাত গত বছর, ২০২৫-এর জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে। পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী ‘দ্য রেজিস্ট্যান্ট ফ্রন্ট’-এর নির্বিচার গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২৬ জন নিরীহ মানুষ।
কড়া জবাব দিতে মাত্র চার দিনের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পাকিস্তানের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়ে রাওয়ালপিন্ডিকে তড়িঘড়ি যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করেছিল ভারতীয় ফৌজ।
সেই সঙ্গেই সাউথ ব্লক স্থগিত করে দেয় ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক সিন্ধু জলচুক্তি।
Water : জলসংকটে পাকিস্তান, সিন্ধু নিয়েই নতুন কূটনীতি
গত বছর প্রবল বর্ষণের জেরে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় জলকষ্ট টের পায়নি পাকিস্তান। কিন্তু ২০২৬-এর গ্রীষ্ম পা রাখতেই হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে খরা কাকে বলে।
পাক গণমাধ্যমগুলিরই দাবি, করাচির প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় জলের(Water) হাহাকার চলছে, চাষবাস লাটে ওঠার জোগাড়।
এই চরম সঙ্কটে দাঁড়িয়ে পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ যখন মুখে বলছেন, “দিল্লি জল(Water) আটকালে যুদ্ধ ছাড়া গতি নেই”, ঠিক তখনই তলে তলে ব্যাঙ্ককের টেবিলে জলের ভিক্ষা চাইছেন পাক কর্তারা।
সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে নতুন দাবি ইসলামাবাদের
সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয় হলো, দিল্লির মন গলাতে এবং সিন্ধুর জলে(Water) নিজেদের ‘ঐতিহাসিক অধিকার’ সাব্যস্ত করতে এক রাতারাতি ভোলবদল ঘটিয়েছে ইসলামাবাদ।
পাক পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাবল ভুট্টো জারদারি সম্প্রতি এক নয়া তত্ত্ব খাড়া করে দাবি করেছেন, “আমরাই সিন্ধু সভ্যতার প্রকৃত উত্তরাধিকারী!”
যে দেশ স্বাধীনতার পর থেকে ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সপ্তদশ বর্ষীয় মহম্মদ বিন কাশেমের সিন্ধ বিজয়কে নিজেদের ইতিহাসের আদিবিন্দু বলে শিখিয়ে এসেছে, তারা আজ কাশেমকে শিকেয় তুলে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবিষ্কৃত মহেঞ্জোদারোর বন্দনা শুরু করেছে।
শাহবাজ শরিফের সরকার তড়িঘড়ি মহেঞ্জোদারোয় পুনরায় খননকাজের নির্দেশ দিয়েছে, সরকারি অনুদানে তৈরি হচ্ছে প্রাক্-ইসলামীয় গান্ধার ও মেহেরগড় সভ্যতা নিয়ে তথ্যচিত্র।
পাক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি তো এক কদম এগিয়ে পাকিস্তানকে ‘সিন্ধু ও গান্ধার সভ্যতার মিলনক্ষেত্র’ বলে বসলেন, যা শুনে আফগানিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইও প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করে বলেছেন— হিন্দুকুশের গান্ধারকে পাকিস্তান যেন ভুলেও নিজের বলে দাবি না করে!
আরএসএসের মন্তব্য ও ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি
কাকতালীয়ভাবে, সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত এবং সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসবাল পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।
তার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওর গত বছরের সেই ‘নিরপেক্ষ স্থানে বৈঠকের’ ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যাওয়ায় জল্পনা তীব্র হয়েছে।
যদিও যাবতীয় উত্তেজনার মাঝে সাউথ ব্লকের এক শীর্ষ আধিকারিক রয়টার্সকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই বৈঠক থেকে রাতারাতি অলৌকিক কিছু ঘটার আশা না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ভারতের কড়া বার্তা
কূটনীতির ধ্রুপদী নিয়ম বলছে, চরম শত্রুভাবাপন্ন দুই রাষ্ট্রও যুদ্ধের আপৎকালীন পরিস্থিতি সামলাতে একটা ‘ব্যাকচ্যানেল’ বা পেছনের দরজা খোলা রাখে মাত্র।
নয়াদিল্লি এখনও ইসলামাবাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি ঠিকই, কিন্তু পাক মাটি থেকে সীমান্ত পারের সন্ত্রাস চিরতরে স্তব্ধ না হওয়া পর্যন্ত যে সিন্ধুর বন্ধ কপাট খুলবে না— ব্যাঙ্ককের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেই কড়া বার্তাই পাকিস্তানকে দিয়ে রেখেছে ভারত।
