সুবর্ণরেখার বাতাসে সোমবার যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল পুরাণের গন্ধ। কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, লোকবিশ্বাস, কিংবদন্তি আর ভক্তির মিশেলে তৈরি এক মধুর উত্তরাধিকার— সেই ঐতিহ্যকেই বুকে নিয়ে সোমবার, ২৯ জুন, গোপীবল্লভপুর(Gopiballavpur)-এ শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব-এর স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে পালিত হল বহু প্রতীক্ষিত দণ্ড মহোৎসব।
পূর্ণ মর্যাদা, আচারানুষ্ঠান ও ভক্তিভাবের মধ্য দিয়ে এ দিনের উৎসব যেন আবারও মনে করিয়ে দিল— পুরাণ কেবল অতীতের গল্প নয়, মানুষের জীবন্ত আবেগও বটে।
Gopiballavpur দণ্ড মহোৎসবের বিশেষত্ব কোথায়?
গোপীবল্লভপুরের(Gopiballavpur) দণ্ড মহোৎসবের বিশেষত্ব এখানেই— এর কেন্দ্রে আছে এক অনন্য মিষ্টতা।
শাস্তির মধ্যেও আশীর্বাদ, তিরস্কারের মধ্যেও করুণা, আর ভক্তির মধ্যেও প্রেম— এই বৈপরীত্যের সূক্ষ্ম সৌন্দর্যই দণ্ড মহোৎসবকে অন্য মাত্রা দেয়।
‘দণ্ড’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ শাস্তি হলেও বৈষ্ণব ভাবধারায় এই দণ্ডই পরিণত হয়েছে ভগবানের কৃপা লাভের এক অলৌকিক উপায়ে।

বৈষ্ণব জাগরণ ও দণ্ড মহোৎসবের ঐতিহাসিক শিকড়
এই মহোৎসবের শিকড় পৌঁছে যায় ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বৈষ্ণব জাগরণে।
শ্রীশ্যামানন্দ প্রভু এবং তাঁর প্রধান শিষ্য শ্রীরসিকানন্দ প্রভু এই অঞ্চলে যে বৈষ্ণব আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা শুধু ধর্মীয় নবজাগরণ ছিল না— ছিল এক নীরব সামাজিক বিপ্লবও।
বর্ণপ্রথা ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁদের অবস্থান তৎকালীন সমাজে বিরাট আলোড়ন তুলেছিল। অব্রাহ্মণ পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ভক্তিকে জাতপাতের ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন।
সেই কারণেই মেদিনীপুর, সিংভূম, ময়ূরভঞ্জের আদিবাসী সমাজ থেকে তথাকথিত নিম্নবর্ণের অসংখ্য মানুষ তাঁদের দর্শনে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
শ্যামানন্দ প্রভুর নূপুরের কিংবদন্তি
তবে দণ্ড মহোৎসবের প্রাণ লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক লোককথায়— যার মধ্যে রয়েছে ভক্তির কোমলতম স্পর্শ।
কিংবদন্তি বলে, বৃন্দাবনে কুঞ্জ পরিষ্কার করার সময় শ্যামানন্দ প্রভু একটি স্বর্ণনূপুর কুড়িয়ে পান। পরে জানা যায়, সেটি স্বয়ং রাধারানি-র নূপুর।
রাধারানির সেই নূপুর ফেরত দেওয়ার জন্য শ্যামানন্দের আকুলতা ছিল এমনই যে তিনি নিজ হাতে তা পরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ভক্তির সেই নিষ্কলুষ আবেগে প্রসন্ন হয়ে রাধারানি তাঁকে আশীর্বাদ করেন, নতুন নাম দেন— ‘শ্যামানন্দ’।
শুধু তাই নয়, তাঁর কপালে এঁকে দেন এক বিশেষ তিলক, যাতে ছিল রাধার পদচিহ্ন ও নূপুরের প্রতীক।

কীভাবে শুরু হল দণ্ড মহোৎসব?
এই কাহিনির সবচেয়ে নাটকীয় অংশ আসে এরপর।
গুরুপ্রদত্ত পুরনো তিলক ত্যাগ করে নতুন তিলক ধারণ করায় গুরু শ্রীহৃদয় চৈতন্য প্রভু প্রবল রোষে ফেটে পড়েন। কথিত আছে, তিনি সেই তিলক মুছে ফেলতে গেলে প্রতিবারই আগুনের ঝলক বেরিয়ে আসে।
শেষ পর্যন্ত দৈববাণীতে তিনি উপলব্ধি করেন— এটি কোনও সাধারণ তিলক নয়, স্বয়ং রাধারানির দান।
কিন্তু গুরু-আজ্ঞা অমান্যের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ শ্যামানন্দকে নির্দেশ দেওয়া হয় প্রতি বছর বারো দিন ধরে বিশাল অন্নভোগের আয়োজন করতে। সেই ‘দণ্ড’ই কালক্রমে হয়ে ওঠে মহোৎসব।
কেন গোপীবল্লভপুর দণ্ড মহোৎসবের প্রধান কেন্দ্র?
প্রথমে বৃন্দাবনে শুরু হলেও পরে শ্রীপাট গোপীবল্লভপুর(Gopiballavpur)-এ এই উৎসবের স্থায়ী আসন গড়ে ওঠে।
শ্রীরসিকানন্দ প্রভু সুবর্ণরেখার তীরে রাধাগোবিন্দ জীউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার পর থেকেই গোপীবল্লভপুর(Gopiballavpur) দণ্ড মহোৎসবের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্নানযাত্রায় ভক্তদের ঢল
আজও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ। বারো দিন ধরে হাজার হাজার ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হন।
অন্নভোগ বিতরণ হয়, চলে নামসংকীর্তন, পূজা, আচার ও ভক্তিসঙ্গীত।
সোমবারের স্নানযাত্রায় সেই আবহ আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। মন্দিরচত্বর জুড়ে ছিল ভক্তসমাগম, শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টানাদ এবং প্রসাদের সুগন্ধ।

ঐতিহ্য, ভক্তি ও মানবিকতার অনন্য মিলন
গোপীবল্লভপুরের(Gopiballavpur) দণ্ড মহোৎসব তাই শুধুই একটি উৎসব নয়; এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ভারতীয় পুরাণের শক্তি কেবল তার অলৌকিকতায় নয়, তার গভীর মানবিক মাধুর্যেও।
যেখানে শাস্তিও শেষ পর্যন্ত ভালোবাসায় রূপ নেয়, যেখানে ভক্তি ভেঙে দেয় জাতপাতের প্রাচীর, আর যেখানে শতাব্দী পেরিয়েও একটি লোককথা মানুষের হৃদয়ে সমান উজ্জ্বল থাকে।
সোমবারের গোপীবল্লভপুর(Gopiballavpur) যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই পুনরাবৃত্তি করল।
কলমে : সুনীপম মহাকুল
