Argentina vs Egypt : ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের অলৌকিক ফুটবলের রহস্য উপন্যাস, কোকাকোলার শহরে মিশররে পিরামিড ভাঙলেন আধুনিক ফুটবলের ফ্যারাও
Argentina vs Egypt : গাজা উপত্যকার যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতেও ফিলিস্তিনিরা বোমা হামলার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বড় স্ক্রিন বসিয়ে এই ম্যাচটি দেখেছেন। ফিলিস্তিনিরা মিশরের প্রতিটি গোলে উল্লাস প্রকাশ করেছেন ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত। ভারতে তখন গভীর রাত। অমিতাভ বচ্চন জেগে আছেন, আর্জেন্টিনা–মিশর খেলা দেখছেন।
ম্যাজিশিয়ানরা বোধ হয় সব সময় এই রকম মাহেন্দ্রক্ষণেরই অপেক্ষা করেন। ১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা(Argentina) হঠাৎ করেই যেন ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে জেগে ওঠে। কী বলবেন সেই মহাকাব্যিক ফ্যারাওয়ের অভিশাপ? আর্জেন্টিনার(Argentina) কাছে এটি শুধু একটি কামব্যাক ছিল না, এটি ছিল বিশ্বাস, জেদ এবং অদম্য মানসিক শক্তির এক মহাকাব্য। আর মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল সেই মিশরীয় ফ্যারাওদের মতো, যাঁরা কেবল সাধারণ মানুষ নন, পৃথিবীতে দেবতাদের প্রতিনিধি বা জীবন্ত ঈশ্বর।

প্রথম প্রত্যাঘাত: রোমেরোর হেডে ফিরে এল আশার আলো
(৭৯ মিনিট)
ডানদিক থেকে পাওয়া একটি শর্ট কর্নার থেকে বল পান এনজো ফার্নান্দেজ। তিনি বক্সের ভেতর একটি ভাসানো ক্রস দেন। মিশরের করিম হাফেজের পেছন থেকে নিখুঁত টাইমিংয়ে লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত এক হেডারে বল জালে জড়ান ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো।
এই গোলটি আর্জেন্টাইন(Argentina) শিবিরে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করে এবং তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনে। এই গোলে অ্যাসিস্ট করার মাধ্যমে লিওনেল মেসি বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার নবম অ্যাসিস্ট পূর্ণ করেন, যা দিয়েগো ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড।
জাদুকরের প্রায়শ্চিত্ত: মেসির গোলেই ফিরল সমতা
(৮৩ মিনিট)
প্রথম গোলের মাত্র চার মিনিট পর, মিশরের গোলরক্ষক শোবেইরের একটি লম্বা কিক মাঝমাঠে আটকে দেন রদ্রিগো ডি পল। বল পেয়ে হুলিয়ান আলভারেজ সরাসরি মিশরীয় রক্ষণের দিকে ছুটে যান এবং একটি দুর্দান্ত রিভার্স পাসের মাধ্যমে বক্সে মেসিকে খুঁজে নেন।
পেনাল্টি মিসের গ্লানি এবং টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার ভয় মাথায় নিয়ে থাকা জাদুকর মেসি প্রমাণ করেন কেন তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায়, প্রায় কোনো ব্যাকলিফট ছাড়াই, তিনি একটি নিখুঁত হাফ-ভলিতে বল জালে জড়ান।
আটলান্টা স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ে। এটি ছিল এই টুর্নামেন্টে তার অষ্টম গোল, যা তাকে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্লিং হালান্ডকে ছাড়িয়ে এককভাবে শীর্ষে নিয়ে যায়। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার ২১তম গোল, যা তার অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতার প্রমাণ।

রুদ্ধশ্বাস সমাপ্তি: অতিরিক্ত সময়ে এনজোর জয়সূচক হেড
(৯০+২ মিনিট)
ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে গড়াচ্ছিল, তখন দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৯০ মিনিটের পর লিয়ান্দ্রো পারেদেস মিশরের একটি ভয়ংকর কাউন্টার অ্যাটাক রুখে দিয়ে দলকে রক্ষা করেন।
এর পরপরই অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে লাউতারো মার্টিনেজ একটি দুর্দান্ত ক্রস ভাসিয়ে দেন বক্সের ভেতর। মিডফিল্ড থেকে ছুটে এসে নিখুঁত এক বুলেট হেডারে গোল করে আর্জেন্টিনার(Argentina) ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন চেলসির তারকা এনজো ফার্নান্দেজ।
স্কালোনির কৌশল: বলের দখল, হাফ-স্পেসে মেসির স্বাধীনতা
কৌশলগত দিক থেকে আর্জেন্টিনার(Argentina) কোচ লিওনেল স্কালোনি ৪-১-৩-২ ফর্মেশন বেছে নিয়েছিলেন।
এই ফর্মেশনে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ গোলরক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন এবং রক্ষণভাগে ছিলেন নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও নিকোলাস টালিয়াফিকো।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে রদ্রিগো ডি পল, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আক্রমণভাগে ছিলেন লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ।
স্কালোনির দলের মূল লক্ষ্য ছিল বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখা, অনুভূমিক পাসিংয়ের মাধ্যমে মিশরের মিডফিল্ডকে ক্লান্ত করা এবং ডানদিকের হাফ-স্পেসে মেসিকে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে দেওয়া। তবে চোটের কারণে নিকো গঞ্জালেজ এবং ফাকুন্দো মেদিনার মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে শুরু থেকেই শঙ্কা ছিল।
মিশরের পরিকল্পনা: শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক
অন্যদিকে, মিশরের কোচ হোসাম হাসান একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ৪-২-৩-১ ছকে দল সাজান।
মোস্তফা শোবেইর গোলপোস্টের প্রহরী হিসেবে ছিলেন, যিনি আগের ম্যাচগুলোতেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিলেন। রক্ষণে মোহাম্মদ হানি, ইয়াসের ইব্রাহিম, রামি রাবিয়া এবং করিম হাফেজ একটি জমাট ব্লক তৈরি করেন।
মাঝমাঠের সুরক্ষায় মারওয়ান আতিয়া এবং হামদি ফাথি (যিনি পরে এমাম আশুরের বদলি হিসেবে নামেন) ডিফেন্স লাইনকে ঢাল হিসেবে রক্ষা করার দায়িত্ব পান।
মিশরের মূল কৌশল ছিল হাই-প্রেসিং এড়িয়ে নিজেদের অর্ধে একটি কমপ্যাক্ট আকার ধারণ করা এবং বল পেলেই মোহাম্মদ সালাহ ও হাইসেম হাসানের গতির ওপর নির্ভর করে বিদ্যুৎ গতির প্রতি-আক্রমণ বা কাউন্টার অ্যাটাক করা। সালাহর উপস্থিতিই আর্জেন্টিনার রক্ষণের জন্য একটি বড় হুমকি ছিল, যা তার সতীর্থদের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
প্রথমার্ধের প্যাপিরাসে রূপকথা
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা(Argentina) প্রত্যাশামতো বলের দখলে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। কিন্তু মিশরের রক্ষণভাগ ছিল নিশ্ছিদ্র এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। স্কালোনির দলের মূল দুর্বলতা—উইং দিয়ে আসা গতির আক্রমণকে প্রতিহত করতে না পারা—এই ম্যাচেও প্রকট হয়ে ওঠে।
ম্যাচের ১৫তম মিনিটে এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই মিশর প্রথম আঘাত হানে। মারওয়ান আতিয়ার একটি নিখুঁত ক্রস থেকে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে দারুণ এক হেডে গোল করে মিশরকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ডিফেন্ডার ইয়াসের ইব্রাহিম।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে এই অপ্রত্যাশিত গোলটি আটলান্টা স্টেডিয়ামের হাজারো আর্জেন্টাইন(Argentina) সমর্থককে স্তব্ধ করে দেয়।
গোল হজম করার মাত্র চার মিনিট পর, ম্যাচের ১৯তম মিনিটে একটি আক্রমণ শানাতে গিয়ে বক্সের ভেতর ফাউলের শিকার হন নিকোলাস টালিয়াফিকো। মিশরের হাইসেম হাসান তাকে আটকাতে গিয়ে অবৈধভাবে বাধা দিলে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে সরাসরি পেনাল্টির নির্দেশ দেন।
২১তম মিনিটে স্পট কিক নিতে আসেন লিওনেল মেসি। কিন্তু তার নেওয়া বাঁ-পায়ের তুলনামূলক দুর্বল শটটি ডানদিকে ঝাঁপিয়ে অসামান্য দক্ষতায় রুখে দেন মোস্তফা শোবেইর।
ভিএআর বিতর্ক: বাতিল হওয়া গোল ঘিরে তুমুল আলোচনা
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে মোস্তফা জিকোর করা গোলটি ভিএআর পর্যালোচনার পর বাতিল হয়ে যায়। রিপ্লেতে দেখা যায়, আক্রমণের শুরুতে একটি ফাউলের ঘটনা ছিল বলে রেফারি সিদ্ধান্ত বদলান।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে মিশর শিবিরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ম্যাচ শেষে কোচ হোসাম হাসান এবং গোলদাতা মোস্তফা জিকো প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানান।
এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলেও দীর্ঘ আলোচনা শুরু হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভিএআর বিতর্ক, নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, শেষ মুহূর্তের জয়—সবকিছুর শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন লিওনেল মেসি।
শেষ কথা: সব বিতর্ক ছাপিয়ে ফুটবলের ফ্যারাও মেসি
১৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের সেই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের ফল বদলায়নি, বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায় যোগ করেছে। আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিলেন আধুনিক ফুটবলের ‘ফ্যারাও’—লিওনেল মেসি।
কলমে : সুনীপম মহাকুল
