VPN : অন্তর্জাল ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তায় বড়সড় কোপ, ভিপিএন পরিষেবা নিয়ন্ত্রণের পথে কড়া আইনি কাঠামোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্র
নয়াদিল্লি:রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকের ডিজিটাল গোপনীয়তার মধ্যে চলমান সংঘাতে এবার এক নতুন এবং চূড়ান্ত অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে।
অন্তর্জালের জগতে ব্যবহারকারীদের পরিচয় এবং অবস্থান গোপন রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন(VPN) পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ওপর রাশ টানতে এক অত্যন্ত কঠোর আইনি কাঠামো প্রণয়নের পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় সরকার।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, প্রস্তাবিত এই নতুন আইনের অধীনে ভিপিএন(VPN) সংস্থাগুলোকে ভারতের মাটিতে তাদের নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন করতে হবে এবং সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সাধনের জন্য নির্দিষ্ট আধিকারিক নিয়োগ করতে হবে।
মূলত, সরকারি নির্দেশে নিষিদ্ধ করা বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন এবং ডিজিটাল আধেয় বা কন্টেন্ট দেখার জন্য দেশের সাধারণ মানুষ যে ক্রমশ এই ধরনের গোপনীয়তা রক্ষাকারী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, সেই প্রবণতা রুখতেই এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে।

VPN : কেন সরকারের নজরে ভিপিএন?
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিপিএন(VPN) এমন একটি প্রযুক্তি যা ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট প্রোটোকল বা আইপি ঠিকানাকে সম্পূর্ণভাবে আড়াল করে দেয়।
এর ফলে ব্যবহারকারী যখন ইন্টারনেট ব্রাউজ করেন, তখন মনে হয় যেন তিনি অন্য কোনো দেশ বা ভৌগোলিক সীমানা থেকে অন্তর্জাল ব্যবহার করছেন।
ভারত সরকারের সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকাগুলো সাধারণত দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই কার্যকর থাকে।
কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের ভিপিএন সার্ভার ব্যবহার করে ভারতীয় নাগরিকরা অনায়াসেই দেশের অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ করা ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন।
বেনামে ইন্টারনেট ব্যবহারের এই স্বাধীনতাকে সরকার এখন রাষ্ট্রীয় নির্দেশিকা লঙ্ঘনের একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

প্রস্তাবিত নতুন আইনে কী কী থাকতে পারে?
নতুন এই আইনি কাঠামোতে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, ভিপিএন(VPN) পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকে স্থানীয় স্তরে অভিযোগ নিষ্পত্তি করার জন্য আধিকারিক নিয়োগ করতে হবে।
শুধু তাই নয়, নিয়মকানুন লঙ্ঘিত হলে স্থানীয় কর্মীদের কারাবাস-সহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০২১ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনে বৃহৎ সামাজিক মাধ্যমগুলোর জন্য যে ধরনের কঠোর শর্ত এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল, অবিকল সেই ধাঁচেই ভিপিএন সংস্থাগুলোকে আইনি জালে বাঁধার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন যে, গত কয়েক মাস ধরে সরকার লক্ষ্য করছে, সরকারি নির্দেশে অবরুদ্ধ করা বিভিন্ন কন্টেন্ট বা অ্যাকাউন্টগুলোতে দেশের মানুষ ভিপিএন(VPN) ব্যবহার করে খুব সহজেই প্রবেশ করছেন, যা আদতে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিচ্ছে।

২০২২ সালের নির্দেশিকা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
এই কঠোর পদক্ষেপের নেপথ্যে রয়েছে ২০২২ সালের একটি ব্যর্থ প্রশাসনিক উদ্যোগের ইতিহাস।
সেই বছর ভারতীয় কম্পিউটার জরুরি সাড়া প্রদানকারী দল বা সার্ট-ইন একটি নির্দেশিকা জারি করে ভিপিএন সংস্থাগুলোকে তাদের গ্রাহকদের নাম, ইমেল আইডি, ফোন নম্বর এবং আইপি ঠিকানার মতো সংবেদনশীল তথ্য পাঁচ বছরের জন্য সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছিল।
কিন্তু গ্রাহকদের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের তীব্র বিরোধিতা করে প্রোটন ভিপিএন, নর্ড ভিপিএন, এক্সপ্রেস ভিপিএন এবং সার্ফশার্কের মতো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় সংস্থাগুলো সেই নির্দেশ মানতে সরাসরি অস্বীকার করে।
তারা ভারতের মাটি থেকে তাদের সমস্ত ভৌত সার্ভার সরিয়ে নেয় এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশ ঘুরিয়ে ভারতীয় ব্যবহারকারীদের ট্র্যাফিক পরিচালনার পথ বেছে নেয়।
সেই সময় প্রোটন ভিপিএন-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে, এই ধরনের গণ-নজরদারিমূলক আইনের কাছে তারা মাথানত করবে না।
পুরনো সেই নির্দেশিকার ব্যর্থতা থেকেই সরকার এবার একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

ভিপিএন ব্যবহারের প্রবণতা কেন বাড়ছে?
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও এই ডিজিটাল লুকোচুরির প্রমাণ স্পষ্ট।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে সরকার যেখানে ১২ হাজারেরও বেশি কন্টেন্ট ব্লক করার নির্দেশ দিয়েছিল, ২০২৫ সালে তা একলাফে বেড়ে ২৪ হাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছে।
সরকারের এই ক্রমাগত অবরুদ্ধকরণের নীতির একটি সরাসরি প্রভাব দেখা যায় গত মাসে, যখন নিট-ইউজি পরীক্ষার পুনর্মূল্যায়নের আগে টেলিগ্রাম অ্যাপটি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
সেই সময়ে প্রোটন ভিপিএন-এর মহাব্যবস্থাপক ডেভিড পিটারসন জানিয়েছিলেন যে, ভারত থেকে তাদের পরিষেবায় নতুন নিবন্ধনের হার একধাক্কায় ১২০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই তথ্যটি সামাজিক মাধ্যম এক্সে প্রকাশ করার পরপরই পিটারসনের অ্যাকাউন্ট এবং তার ওই পোস্টটি ভারতে ব্লক করে দেওয়া হয়।
ডিজিটাল গোপনীয়তা বনাম রাষ্ট্রীয় নজরদারি
সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে, ডিজিটাল বিশ্বে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির এই অসম লড়াইয়ে কেন্দ্র এখন বিদেশি প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণের ফাঁস আরও কঠোর করতে বদ্ধপরিকর।
কলমে : সুনীপম মহাকুল
