Keleghai : দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রবেশ এবং টানা নিম্নচাপের জেরে বর্ষার শুরুতেই অবিভক্ত মেদিনীপুরকে প্রবল ভয় দেখাতে শুরু করেছে কেলেঘাই নদী। কেন প্রতি বছর ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কেলেঘাই? কেলেঘাই(Keleghai) নদীর বর্তমান ভৌগোলিক সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যার মূল কারণ নিহিত রয়েছে এর গতিপথের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্যে।
‘আদি কেলেঘাই’-এর মৃত্যু: কোথায় হারিয়ে গেল প্রাকৃতিক নদীপথ?
১৭৭৭ সালের জেমস রেনেল-এর মানচিত্র অনুযায়ী, কেলেঘাই(Keleghai) নদী পূর্বে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে পটাশপুরের আমগাছিয়া, মংলামাড়ো হয়ে সরাসরি রসুলপুর মোহনায় বঙ্গোপসাগরে পতিত হতো। এটিই ছিল “আদি কেলেঘাই”। কিন্তু পরবর্তীতে আমগাছিয়ার কাছে মনুষ্যসৃষ্ট হস্তক্ষেপে এই ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক প্রবাহ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়।

Keleghai : অস্বাভাবিক গতিপথ: কেন বেড়েছে বন্যার ঝুঁকি?
স্বাভাবিক নিষ্কাশন পথ হারিয়ে নদীর জল জোরপূর্বক পূর্ব দিকে কপালেশ্বরী নদীর খাদে চালিত হয়। এর ফলে জলধারাকে হুগলি নদীতে পৌঁছানোর জন্য প্রায় ২০ গুণ বেশি দীর্ঘ এবং অর্ধবৃত্তাকার পথ অতিক্রম করতে হয়।

ভৌগোলিক ‘বাটি’ আকৃতি বাড়াচ্ছে জলাবদ্ধতা
পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি, সবং থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুর পর্যন্ত মধ্য অববাহিকার ভূমিরূপ অনেকটা বাটির মতো। এখানে নদীর ঢাল অত্যন্ত কম থাকায় বর্ষার বিপুল জলরাশি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না, ফলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলবদ্ধতা।
সরকারি ব্যর্থতা: কেকেবি প্রকল্পের কঙ্কালসার দশা
পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১০ সালে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে “কালীঘাই-কপালেশ্বরী-বাগুই (কেকেবি) বেসিন ড্রেনেজ স্কিম” অনুমোদিত হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ। ভারতের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী এই প্রকল্পের নকশা ও রূপায়ণে চরম গাফিলতি রয়েছে।
১. জমি অধিগ্রহণে ব্যর্থতা
প্রয়োজনীয় জমির মাত্র ৩৫% অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়েছিল, যার ফলে কাজ থমকে যায়।
২. অবৈজ্ঞানিক নকশা
খরচ বাঁচাতে বাঁধের ঢাল (২এইচ:ভি) অবৈজ্ঞানিক ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা বাঁধের স্থায়িত্বকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
৩. অসম্পূর্ণ খনন
নদী ও খালগুলিকে নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী চওড়া করা হয়নি, ফলে জল ধারণক্ষমতা বাড়েনি।
গোদের ওপর বিষফোঁড়া: ‘ময়না মডেল’ ও কারখানার দূষণ
কৃষিতে ক্ষতির কারণে ময়না ও সংলগ্ন ব্লকের কৃষকরা বিস্তীর্ণ নিচু ধানের জমিকে কৃত্রিম পুকুর বা বিশাল ভেড়িতে রূপান্তরিত করে মাছ চাষ শুরু করেছেন, যা “ময়না মডেল” নামে পরিচিত। অর্থনৈতিকভাবে সফল হলেও পরিবেশগত দিক থেকে এটি একটি বিপর্যয়।
জলনিকাশী পথে অবরোধ
কৃত্রিম পুকুরের উঁচু বাঁধগুলি প্রাকৃতিক জলনিকাশী পথগুলিকে সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দিয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এখন বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নদী দূষণের বাড়তি সংকট
এর পাশাপাশি, পটাশপুর ও এগরার রং কারখানাগুলি (ডাইং ইউনিটগুলি) তাদের অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি কেলেঘাইতে ফেলছে, যা নদীর জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যজীবীদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছে।
সমাধানের দিশা: ডাঃ কে. পি. প্রধানের ‘পাইপলাইন মডেল’
কেলেঘাইয়ের(Keleghai) বন্যা সমস্যা সমাধানে প্রথাগত নদীখাত খনন বা বাঁধ নির্মাণ যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তা আজ প্রমাণিত। এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন প্রযুক্তিগত সমাধানের প্রয়োজন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অভিনব প্রস্তাবটি দিয়েছেন ঝাড়গ্রামের প্রবীণ চিকিৎসক ডাঃ কে. পি. প্রধান।
কী এই ‘পাইপলাইন মডেল’?
মিসিং লিংক সংযোগ
ডাঃ প্রধানের ধারণা অনুযায়ী, কেলেঘাই(Keleghai) নদীর গতিপথের যে অংশগুলি বিচ্ছিন্ন বা অবরুদ্ধ হয়ে গেছে (মিসিং লিঙ্ক), সেগুলিকে সরাসরি আন্ডারগ্রাউন্ড বা ওভারহেড বৃহৎ ব্যাসের পাইপলাইনের মাধ্যমে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
সরাসরি সমুদ্রে নিষ্কাশনের পরিকল্পনা
বর্ষার সময় যখন নদীর জলস্তর বিপদসীমা অতিক্রম করবে, তখন এই বাড়তি জলকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পাম্প করে বা অভিকর্ষের সাহায্যে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে বা নিকটবর্তী বড় মোহনায় ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
জমি অধিগ্রহণের বাধা কাটানোর সম্ভাবনা
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকায় খাল খনন বা নদী প্রশস্ত করার প্রয়োজন হবে না। ফলে সরকারি প্রকল্পগুলির অন্যতম বড় বাধা—বিপুল জমি অধিগ্রহণের আইনি ও সামাজিক জটিলতা—অতিক্রম করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে আরও যেসব পদক্ষেপ জরুরি
১. আদি কেলেঘাই পুনরুদ্ধার
আমগাছিয়া স্লুইস গেট থেকে মংলামাড়ো পর্যন্ত একটি সংযোগকারী খাল কেটে নদীর ঐতিহাসিক দক্ষিণমুখী গতিপথ আংশিকভাবে হলেও ফিরিয়ে আনা জরুরি।
২. নদী শাসন ও দূষণ রোধ
নদীর বুক থেকে অবৈধ মাছ ধরার ‘পাটা’ উচ্ছেদ করা এবং রং কারখানাগুলিকে বর্জ্য পরিশোধনাগার বসাতে বাধ্য করা।
৩. ময়না মডেলের নিয়ন্ত্রণ
মৎস্যচাষের পুকুরের বাঁধের উচ্চতা নির্দিষ্ট করা যাতে প্রাকৃতিক জলনিকাশী ব্যবস্থা সচল থাকে।
উপসংহার
কেলেঘাই নদী আজ মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের শিকার। বর্ষার শুরুতেই যে ভয়াল রূপ মেদিনীপুরের বুকে আছড়ে পড়ছে, তা ঠেকাতে ডাঃ প্রধানের পাইপলাইন মডেলের মতো উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা এবং আদি জলপথের পুনরুদ্ধারের মতো বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায়, প্রতি বছর বর্ষাতেই মেদিনীপুরবাসীকে কেলেঘাইয়ের এই সর্বনাশা রোষের শিকার হতে হবে।
কলমে : সুনীপম মহাকুল
