নিজস্ব প্রতিবেদনঃ হাঁড়িয়ার ধর্মীয় ব্যবহার ও অপব্যবহারের ফারাক টেনে আদিবাসী সমাজের উন্নয়নের বার্তা দিলেন মন্ত্রী অমিয় কিস্কু(Amiya Kisku)। জঙ্গলমহলের আদিবাসী সমাজের উন্নয়নের পথে নেশা, স্বাস্থ্যক্ষয় এবং স্কুলছুট—এই তিন সমস্যাকেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরলেন রাজ্যের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, উদ্যানপালন ও কৃষি প্রতিমন্ত্রী।
সানন্দা নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “পুজো-পার্বণে হাড়িয়ার ধর্মীয় ব্যবহার আছে, কিন্তু বেহিসেবি ব্যবহার সমাজের ক্ষয়ের কারণ।” এই অমোঘ বার্তার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত একটি প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক অবক্ষয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানার চেষ্টা করেছেন।

Amiya Kisku : হাড়িয়ার ধর্মীয় ব্যবহার বনাম অপব্যবহার
(Amiya Kisku)তাঁর মূল বক্তব্যটি একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তাঁর নিজস্ব ভাষায়,
“হাড়িয়া বা দেশি মদ—এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। তবে আমাদের বুঝতে হবে, বিভিন্ন জাতি-ধর্ম নিয়ে সমাজ গড়ে উঠেছে। আমাদের আদিবাসী সমাজে বংশপরম্পরায় কিছু রেওয়াজ চলে আসছে। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা পুজো-পার্বণে কিছুটা হাড়িয়ার ব্যবহার হয়। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র পুজোর জন্যই নির্দিষ্ট, অন্য কিছুর জন্য নয়। সেটার বেহিসেবি ব্যবহারই আমাদের সমাজের ক্ষয়ের একটা বড় কারণ এবং পিছিয়ে পড়ারও অন্যতম কারণ।”
শিক্ষা ও স্কুলছুট রোধে জোর
একইসঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি(Amiya Kisku) বলেন,
“পুরো সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বাড়াতে হবে, শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। এখনও দেখা যায় ক্লাস ফোর বা ক্লাস এইটের পর অনেকেই স্কুলছুট হয়ে যাচ্ছে। এটা বন্ধ করা দরকার। এগুলোও আমার টার্গেটের মধ্যে আছে।”
আদিবাসী সংস্কৃতিতে হাঁড়িয়ার ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব
লোককথা অনুসারে, মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এবং বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মারাং বুরু (বা লিটা দেবতা) পিলচু হাড়াম এবং পিলচু বুডহিকে জঙ্গল থেকে বিশেষ ভেষজ সংগ্রহ করে হাড়িয়া তৈরি করতে শেখান। তাঁরা এই পানীয় পান করে নিজেদের আদিম লজ্জা ভুলে মিলিত হন এবং তাঁদের মিলনের ফলেই সাঁওতাল জাতির বিস্তার ঘটে।
এই পৌরাণিক আখ্যানের কারণেই হাড়িয়াকে আদিবাসী সমাজে একটি পবিত্র পানীয় হিসেবে মান্য করা হয় এবং এটি মানবসৃষ্টির আদিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হয়।

কীভাবে তৈরি হয় হাঁড়িয়া?
হাড়িয়া বা পচুই তৈরির পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং এটি আদিবাসীদের গভীর বাস্তুতান্ত্রিক জ্ঞানের পরিচায়ক।
এটি মূলত সিদ্ধ চাল এবং জঙ্গল থেকে সংগৃহীত ভেষজ উদ্ভিদের মিশ্রণ (রানু বা বাখর ট্যাবলেট) দিয়ে তৈরি হয়। এই রানু ট্যাবলেট তৈরিতে কালমেঘ, শতমূলী, হাতিশুঁড়-সহ প্রায় ২১ ধরনের বন্য লতাপাতা, শিকড় এবং ছাল ব্যবহার করা হয়।
প্রাকৃতিকভাবে গাঁজানোর ফলে এই পানীয়তে অ্যালকোহলের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে (১.২% থেকে ২% এর কাছাকাছি), যা আধুনিক বাণিজ্যিক মদের তুলনায় নগণ্য।
ঐতিহ্য থেকে বাণিজ্যিকীকরণ: কোথায় বদল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অমিয় কিস্কু তাঁর মন্তব্যে যে “বেহিসেবি ব্যবহার” বা অপব্যবহারের কথা বলেছেন, তা মূলত আদিবাসী সমাজের বর্তমান প্রজন্মের একটি মর্মান্তিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
প্রথাগতভাবে হাড়িয়া ছিল পুজো এবং বিশেষ উৎসবের জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু কালক্রমে এটি একটি দৈনন্দিন নেশায় পরিণত হয়েছে, যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে তার জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে।
ঐতিহ্যের বাণিজ্যিকীকরণ এই অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। একসময় হাড়িয়া শুধুমাত্র বাড়িতে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে তৈরি হতো এবং তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতো না। কিন্তু বর্তমানে এটি একটি লাভজনক কুটির শিল্পে পরিণত হয়েছে।
অভাবের তাড়নায় এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে বহু আদিবাসী পরিবার, বিশেষ করে মহিলারা, রাস্তার ধারে বা সাপ্তাহিক হাটে হাড়িয়া তৈরি করে বিক্রি করেন। এই সহজলভ্যতার কারণে আদিবাসী পুরুষদের মধ্যে, এমনকি তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও হাড়িয়া এবং অন্যান্য চোলাই মদ পানের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রথাগত হাড়িয়ার তুলনায় বাজারে বিক্রি হওয়া সস্তা অ্যালকোহলে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক মেশানো থাকে যা দ্রুত নেশাগ্রস্ত করে এবং স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনগ্রসরতার পেছনে এই ব্যাপক মদ্যপান অন্যতম প্রধান কারণ।
নেশা, দারিদ্র্য ও শিক্ষার ওপর প্রভাব
“নেশার জন্য নয়” – কিস্কুর(Amiya Kisku) এই শব্দবন্ধটি গভীর আর্থ-সামাজিক তাৎপর্য বহন করে।
যখন একজন দিনমজুর বা প্রান্তিক চাষি তাঁর সারাদিনের আয়ের একটি বড় অংশ মদ্যপানের পেছনে ব্যয় করেন, তখন তাঁর পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনগুলি—যেমন পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং শিক্ষা—চরমভাবে অবহেলিত হয়।
নেশার এই বেহিসেবি ব্যবহারের সরাসরি প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের উপর। পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পায় এবং পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন শিশুদের শিক্ষার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়।
আদিবাসী সমাজে ঐতিহাসিকভাবে যে নারী-পুরুষের সমতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি ছিল, দীর্ঘস্থায়ী নেশার প্রকোপে তা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।
(Amiya Kisku)কিশকু ঠিক এই অবক্ষয়কেই “সমাজের ক্ষয়ের একটা বড় কারণ” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কারণ একটি সমাজ যখন তার অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূলধন নেশার পেছনে ব্যয় করে, তখন তার পক্ষে মূল স্রোতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
Amiya Kisku :এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে অমিয় কিস্কুর বক্তব্য
সানন্দা নিউজে একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক সুদীপ্ত মিত্রকে অমিয়বাবু(Amiya Kisku) বলেন,
“হাড়িয়া বা দেশি মদ—এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। তবে আমাদের বুঝতে হবে, বিভিন্ন জাতি-ধর্ম নিয়ে সমাজ গড়ে উঠেছে। আমাদের আদিবাসী সমাজে বংশপরম্পরায় কিছু রেওয়াজ চলে আসছে। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা পুজো-পার্বণে কিছুটা হাড়িয়ার ব্যবহার হয়। কিন্তু সেটা শুধুমাত্র পুজোর জন্যই নির্দিষ্ট, অন্য কিছুর জন্য নয়। সেটার বেহিসেবি ব্যবহারই আমাদের সমাজের ক্ষয়ের একটা বড় কারণ এবং পিছিয়ে পড়ারও অন্যতম কারণ।”
শিক্ষার হার বাড়ানোর লক্ষ্যে
আর শিক্ষা প্রসঙ্গে তাঁর কোট—
“পুরো সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বাড়াতে হবে, শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। এখনও দেখা যায় ক্লাস ফোর বা ক্লাস এইটের পর অনেকেই স্কুলছুট হয়ে যাচ্ছে। এটা বন্ধ করা দরকার। এগুলোও আমার টার্গেটের মধ্যে আছে।”
কলমে : সুনীপম মহাকুল
