নিজস্ব সংবাদদাতা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে এক ১২ বছরের নিষ্পাপ নাবালিকার নিথর দেহ স্থানীয় পুকুর থেকে উদ্ধারকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়। মেয়েটিকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে ধ*র্ষণ ও খু*ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই নারকীয় ঘটনার খবর জানাজানি হতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন এলাকাবাসী। অপরাধীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে পথ অবরোধ করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তারা।
বারুইপুর : খাবার কিনতে গিয়ে নিখোঁজ, রাতে মিলল নিথর দেহ
মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে বারুইপুরের ধপধপি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত সূর্যপুর হাট এলাকায়। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিছক একটু খাবার কেনার জন্য শনিবার বিকেল ৪টে নাগাদ বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ওই নাবালিকা। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেলেও সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের লোকজনের অভিযোগ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পরপরই চারজন মিলে তাকে অপহরণ করে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও মেয়েটি না ফেরায় আতঙ্কিত পরিবার এবং প্রতিবেশীরা হন্যে হয়ে চারিদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। এরপরই আসে সেই চরম দুঃসংবাদ—বাড়ি থেকে কিছু দূরে একটি পুকুরের জলে ভাসছিল মেয়েটির নিথর শরীর।
নৃশংস নির্যাতন ও খু*ন! রুজু পকসো মামলা
বারুইপুর থানার পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, শ্বাসরোধ করে খু*ন করা হয়েছে এই নাবালিকাকে। তবে শরীরের একাধিক ক্ষতচিহ্ন দেখে পরিবার ও প্রতিবেশীদের স্পষ্ট অভিযোগ, নৃশংসভাবে যৌন নির্যাতন করার পরই তাকে খু*ন করে প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে পুকুরের জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ধ*র্ষণের শিকার সে হয়েছে কি না, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।
প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা জানিয়েছেন যে, ঘটনার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই BNS এবং POCSO (পকসো) আইনের অধীনে মামলা রুজু করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহের জন্য বিশেষজ্ঞদের ডাকা হয়েছে।
দেহ উদ্ধার ঘিরে পুলিশ-জনতা ধস্তাধস্তি, থমথমে এলাকা
এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দলে দলে গ্রামবাসী রাস্তায় নেমে আসেন। পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতি এবং এলাকায় ঠিকমতো নজরদারি না রাখার অভিযোগ তুলে উত্তেজিত জনতা পথ অবরোধ করেন, যার ফলে এলাকার সমস্ত যানচলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়।
দোষীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তার না করা এবং দ্রুত তদন্তের আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তারা রাস্তা ছাড়বেন না কিংবা ময়নাতদন্তের জন্য দেহ পুলিশকে নিতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারুইপুর পুলিশ জেলার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। অবরোধ তুলতে এবং দেহটি উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর সময় উত্তেজিত জনতার সাথে পুলিশের তীব্র ধস্তাধস্তিও হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ভবানী ভবনে ডাকলেন মুখ্যমন্ত্রী
এই চরম বিপদের দিনে শোকার্ত বাবার সাথে কথা বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ভুক্তভোগী বাবার দাবি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী তাকে আগামী মঙ্গলবার ভবানী ভবনে দেখা করার জন্য বলেছেন এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
কড়া নজরদারিতে আইনি প্রক্রিয়া
বর্তমানে মৃতদেহটি বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এবং সম্পূর্ণ ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে দেহ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া চলছে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য দেহটি কলকাতার কাটাপুকুর মর্গে পাঠানো হবে।
পুলিশের বক্তব্য:
এক পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা দেহটি উদ্ধার করেছি এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠাচ্ছি। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষকে শান্তি বজায় রাখার অনুরোধ করছি, দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে আমরা সবরকম চেষ্টা করছি।”
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনকে স্পষ্ট ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। তাদের দাবি, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা না হলে তারা আরও বৃহত্তর ও তীব্র আন্দোলনে নামবেন। এই ঘটনার পর থেকে গোটা সূর্যপুর হাট এলাকায় পরিস্থিতি চরম থমথমে ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

