বর্তমানে সারা দেশে ই-২০ বা ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নতুন জ্বালানি নিয়ে একাধিক ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়িয়ে পড়েছে।
পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এবার সেই ১০টি বহুল চর্চিত গুজবের প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হলো।
প্রথমেই বলা প্রয়োজন, ইথানল কোনও নতুন আবিষ্কার বা অপরীক্ষিত জ্বালানি নয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে স্বয়ং মোটরগাড়ি শিল্পের পথিকৃৎ হেনরি ফোর্ড একে ভবিষ্যতের জ্বালানি আখ্যা দিয়েছিলেন এবং বর্তমানে আমেরিকা, ব্রাজিল, কানাডা ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলি অত্যন্ত সফলভাবে এই জ্বালানি ব্যবহার করছে।
গুজব ১: এক লিটার ইথানল তৈরিতে ১০ হাজার লিটার জল লাগে
সবচেয়ে বড় গুজবটি রটেছে জলের ব্যবহার নিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে, এক লিটার ইথানল তৈরিতে দশ হাজার লিটার জল লাগে।
বাস্তবে আধুনিক জিরো লিকুইড ডিসচার্জ (ZLD) প্রযুক্তির প্ল্যান্টে এক লিটার ইথানলের জন্য মাত্র তিন থেকে পাঁচ লিটার প্রক্রিয়াজাত জল ব্যবহার করা হয়।
এছাড়া জাতীয় খাদ্য সুরক্ষার চাহিদা মেটানোর পর শুধুমাত্র উদ্বৃত্ত চাল ও ভুট্টা থেকেই এই ইথানল তৈরি করা হয়।

গুজব ২: ই-২০ ব্যবহার করলে গাড়ির মাইলেজ অনেক কমে যায়
দ্বিতীয়ত, ই-২০ ব্যবহারের ফলে গাড়ির মাইলেজ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার দাবিটিও সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।
ভারত সরকারের অনুমোদিত সংস্থা ‘এআরএআই’ (ARAI)-এর করা হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ফিল্ড ট্রায়ালে দেখা গিয়েছে, কার্যকারিতা কমার হার অত্যন্ত সামান্য।
বরং ইথানলের উচ্চ অকটেন রেটিংয়ের কারণে গাড়ির অ্যাক্সিল্যারেশন এবং ইঞ্জিন পারফরম্যান্স অনেক বেশি মসৃণ হয়।

গুজব ৩: ই-২০ ইঞ্জিনের ক্ষতি করে ও ওয়ারেন্টি বাতিল হয়ে যায়
অনেকেই দাবি করছেন যে, এই জ্বালানি ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ দ্রুত ক্ষয় করে এবং এর ফলে গাড়ির ওয়ারেন্টি ও বিমা বাতিল হয়ে যেতে পারে।
সরকারি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়া বা ধাতব যন্ত্রাংশের ক্ষয়ের কোনও প্রমাণ নেই, বরং এর ফলে কার্বন মনোক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্যাসের নির্গমন আগের চেয়ে অনেক কমে যায়।
খুব পুরোনো গাড়ির ক্ষেত্রে বড়জোর রবারের গ্যাসকেট বদলানোর প্রয়োজন হতে পারে।
গাড়ির প্রস্তুতকারকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ‘সিয়াম’ (SIAM) এবং বিমা সংস্থাগুলিও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে তৈরি ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গাড়ির ওয়ারেন্টি বা বিমার বৈধতায় কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

গুজব ৪: ইথানলে চিনি থাকায় পিঁপড়ে বা মৌমাছি আসে
এর পাশাপাশি, ইথানলে চিনি থাকায় ফুয়েল ক্যাপে পিঁপড়ে ও মৌমাছি আকৃষ্ট হওয়ার দাবিটিও সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক।
ফুয়েল-গ্রেড ইথানল এমন একটি পাতন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় যেখানে কোনও শর্করা অবশিষ্ট থাকে না, উল্টে পোকা-মাকড় দূরে রাখার উপাদান এতে মেশানো থাকে।

গুজব ৫: সরকার সুপ্রিম কোর্টে ই-২০-কে পরীক্ষামূলক বলেছে
সম্প্রতি আরও একটি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে যে, সরকার নাকি সুপ্রিম কোর্টে স্বীকার করেছে ই-২০ আসলে একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ।
ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল স্পষ্ট জানিয়েছেন, এমন দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সুপ্রিম কোর্টের ওই মামলাটি ছিল কেবলমাত্র তেল বিপণন সংস্থাগুলির ইথানল সংগ্রহের চুক্তি সংক্রান্ত একটি বিষয় নিয়ে।

গুজব ৬: পেট্রোলে সরাসরি আখের রস মেশানো হচ্ছে
অন্যদিকে, সরাসরি পেট্রোলে আখের রস মেশানোর যে ভিডিওগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে, সেগুলিও সম্পূর্ণ ভুয়ো এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা ছড়ানোর জন্য তৈরি।

গুজব ৭: ই-২০ জ্বালানিতে সহজেই জল ঢুকে যায়
পেট্রোল পাম্পের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাঙ্ক বা আধুনিক গাড়ির ফুয়েল ট্যাঙ্কে যাতে ই-২০ জ্বালানির কারণে কোনওভাবেই জল ঢুকতে না পারে, তার জন্য আধুনিক সিলিকা জেল ট্র্যাপ এবং সিল্যান্টের মতো কড়া সুরক্ষা ব্যবস্থা মজুত থাকে।

গুজব ৮: ইথানল প্ল্যান্ট পরিবেশের ক্ষতি করছে
সর্বশেষ যে দাবিটি করা হচ্ছে তা হলো, ইথানল প্ল্যান্ট পরিবেশ ও কৃষির চরম ক্ষতি করছে।
বাস্তবে এর ঠিক বিপরীতটাই ঘটছে।
পরিবেশ মন্ত্রকের কড়া ছাড়পত্র মেনেই আধুনিক প্ল্যান্টগুলি তৈরি হয় এবং এগুলি সাধারণত বায়োমাস-ভিত্তিক বিদ্যুতে চলে।

ই-২০ কর্মসূচির বাস্তব সাফল্য
২০১৪ সাল থেকে চলা এই কর্মসূচির ফলে ভারত ইতিমধ্যে অপরিশোধিত তেল আমদানির ক্ষেত্রে প্রায় ১.৯০ লক্ষ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেছে।
শুধু তাই নয়, কৃষকদের হাতে ১.৬০ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থ দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং বাতাসে প্রায় ৯৩০ লক্ষ মেট্রিক টন কার্বন নির্গমন কমানো গিয়েছে।
তাই ই-২০ ইথানল মিশ্রণ ভারতের জন্য কোনও ক্ষতিকর পরীক্ষা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও কৃষকদের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও সফল পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র
১২.০৮.২০২৫ তারিখের MoP&NG-এর পিআইবি রিলিজ (PRID 2155558)
১৬.০৬.২০২৬ তারিখের X-এ পিআইবি ফ্যাক্ট-চেক সংক্রান্ত পোস্ট
১৭.০৬.২০২৬ তারিখের X-এ বিপিসিএল-এর পোস্ট (পিঁপড়ে/মৌমাছির দাবি)
২৩.০৬.২০২৬ তারিখের MoP&NG-এর পিআইবি রিলিজ (বিভ্রান্তিকর দাবি এবং পুরানো ছবি)
৩০.০৬.২০২৬ তারিখের পিআইবি রিলিজ (ইথানল বরাদ্দের বিষয়ে বিপিসিএল-এর এসএলপি-তে সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রমের স্পষ্টীকরণ)
কলমে : সুনীপম মহাকুল
