খড়্গপুরে চা-চক্রে যোগ দেওয়ার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। আরজি করের চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের মামলা, শালবনির জমি সংক্রান্ত তদন্ত, তৃণমূলের ‘থ্রেট কালচার’, টোটো চলাচল, খড়্গপুরে চুরি-ছিনতাই, রাস্তার বেহাল দশা এবং অন্নপূর্ণা যোজনা—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের মতামত জানান তিনি।

আরজি কর মামলা নিয়ে দিলীপ ঘোষের বক্তব্য
আরজি করের চিকিৎসক ধর্ষণ-খুনের ঘটনার দুই বছর পূর্তিতে নির্যাতিতাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, আরজি করের মামলা পুনরায় খোলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
তাঁর কথায়, ঘটনাটি শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশ ও বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে, তার জন্য সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে এবং সমাজকেও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শালবনির জমি মামলায় সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে
শালবনির জমি মামলায় ভাইপোর পিএ সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, সিআইডির তদন্ত চলছে। সুমিত তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্য, বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় তাঁর নাম শোনা যাচ্ছে। তবে তদন্তে যা উঠে আসবে, সেটাই সকলে মেনে নেবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুমিত ভবানী ভবন থেকে বেরিয়ে ভাইপোর বাড়িতে যাওয়ার প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, “ওর PA ওর বাড়িতেই তো যাবে।” কোথায় কোথায় তিনি যেতেন, তদন্তে সেই বিষয়গুলিও সামনে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তৃণমূলে ‘তোলাবাজি’ ও ‘তৃণমূলীকরণ’ নিয়ে পোস্টার
সল্টলেকে বিজেপি কর্মীর পোস্টারে দলের মধ্যে ‘তৃণমূলীকরণ’ এবং তোলাবাজি বাড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, কে পোস্টার লাগাচ্ছেন বা কে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করছেন, তা যে কেউ করতে পারেন।
তবে অভিযোগ সত্যি হলে দলের বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
RSS-এর ‘লোকতন্ত্র সেনানী’ সম্মান প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ
জরুরি অবস্থার সময় RSS-এর স্বয়ংসেবকদের ভূমিকা প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর দাবি, জরুরি অবস্থায় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে প্রায় ৬০ হাজার স্বয়ংসেবক জেলে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে জনতার সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁরা মুক্তি পান।
দিলীপ ঘোষ বলেন, এতদিন তাঁদের যোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, যে রাজ্যগুলিতে বিজেপি সরকার এসেছে, সেখানে দেশের জন্য লড়াই করা ব্যক্তিদের সম্মান জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁদের মাসিক ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারি বাসে মহিলাদের না তোলার অভিযোগ
সরকারি বাসে হাত দেখালেও মহিলাদের বাসে তোলা হচ্ছে না—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, বাসে জায়গা না থাকলে যাত্রী তোলা সম্ভব নয়।
তাঁর বক্তব্য, বহু মানুষ দীঘা বা দার্জিলিংয়ের মতো পর্যটনকেন্দ্রে যাচ্ছেন। তবে রাজ্যে সরকারি বাসের সংখ্যা কম রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। মহিলারা যাতে সরকারি বাস পরিষেবার সুবিধা পান, তার জন্য আরও বাস কেনা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হাইওয়েতে টোটো চলাচল নিয়ে কড়া পদক্ষেপের দাবি
জাতীয় ও রাজ্য সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় টোটো ও ই-রিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা এবং পুলিশের নজরদারি প্রসঙ্গেও নিজের মতামত জানান দিলীপ ঘোষ।
তিনি বলেন, জেলার ডিএম ও এসপিদেরও নিশ্চিত করতে হবে যাতে টোটো হাইওয়েতে না চলে। তাঁর দাবি, টোটোর কারণে অনেক জায়গায় দুর্ঘটনা ঘটছে। রাস্তার অবস্থা খারাপ থাকায় কোথাও কোথাও টোটো উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
দিলীপ ঘোষের কথায়, হাইওয়েতে টোটো চললে যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি হাইওয়েতে টোটো বা সাইকেল চলাচল করলে অন্যান্য যানবাহনের চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দুর্নীতি নিয়ে সরব দিলীপ ঘোষ
কয়লা, বালি, গরু ও চাকরির পর এবার জল নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে—এমন প্রশ্নের জবাবে দিলীপ ঘোষ বলেন, “যা চুরি করার হয়ে গেছে, সবকিছুর তদন্ত হচ্ছে।”
যেখানে যেখানে দুর্নীতি হয়েছে, সেখানে তদন্ত করা হবে বলে দাবি করেন তিনি। তবে একইসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, একসঙ্গে সমস্ত বিষয়ের তদন্ত করার মতো পর্যাপ্ত পুলিশ ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো বর্তমানে নেই।
মানুষকে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়ে দিলীপ ঘোষ বলেন, অভিযোগ করা হলে পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।
‘তোলাবাজি করলে ডিম ভাজি ফ্রি’ পোস্টার নিয়ে মন্তব্য
সল্টলেকে ‘তোলাবাজি করলে ডিম ভাজি ফ্রি’ লেখা পোস্টার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন দিলীপ ঘোষ।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকে হাসি-মজা করছেন। তবে তাঁর অভিযোগ, দুর্নীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষ তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পাননি।
‘থ্রেট কালচার’-এর অভিযোগ তুলে দিলীপ ঘোষ বলেন, সাধারণ মানুষকে এতদিন ভয়ের পরিবেশে রাখা হয়েছিল এবং এখন তাঁরা সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।
‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পোস্ট
অন্যদিকে, তৃণমূলের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, তৃণমূলের বিধায়ক ও সাংসদরাও ‘থ্রেট কালচার’-এর মধ্যে ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, এই ‘থ্রেট কালচার’ বন্ধ হওয়া উচিত এবং রাজনীতি থেকে এই ধরনের সংস্কৃতি দূর করা দরকার।
খড়্গপুরে চুরি-ছিনতাই নিয়ে উদ্বেগ
খড়্গপুরে চুরি ও ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ নিয়েও সরব হন দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, এই বিষয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলার পুলিশ সুপারকেও নজর দিতে হবে।
চুরি-ছিনতাই রুখতে পুলিশ প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজ্যের রাস্তার বেহাল দশা নিয়ে অভিযোগ
জাতীয় সড়কসহ রাজ্যের বিভিন্ন রাস্তার বেহাল দশা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, টানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে কোথাও কোথাও রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত অংশে তাপ্পি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
বৃষ্টির কারণে রাস্তার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের রাস্তাগুলি মেরামত করা দরকার। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে স্থায়ীভাবে রাস্তা মেরামতের কাজ করা উচিত বলেও জানান তিনি।
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে দিলীপ ঘোষের বক্তব্য
অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা মহিলারা পাচ্ছেন না—এই অভিযোগের প্রসঙ্গে দিলীপ ঘোষ বলেন, এই প্রকল্পের সুবিধা সবাই পাবেন না।
তাঁর দাবি, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ মহিলার নাম দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে কারা প্রকৃতপক্ষে সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা সব ক্ষেত্রে যাচাই করা হয়নি।
দিলীপ ঘোষ জানান, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ১৭ তারিখের পর থেকে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা দেওয়া চালু থাকবে। তবে এই প্রকল্প সকলের জন্য নয় এবং সবাই যে এই সুবিধা পাবেন, এমনটা মনে করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একাধিক ইস্যুতে রাজ্য সরকারকে নিশানা
খড়্গপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দিলীপ ঘোষ একের পর এক ইস্যুতে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন। আরজি কর মামলা থেকে শুরু করে দুর্নীতি, ‘থ্রেট কালচার’, টোটো চলাচল, আইনশৃঙ্খলা, রাস্তার সমস্যা এবং সরকারি প্রকল্প—বিভিন্ন বিষয়েই তিনি নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর মন্তব্য ঘিরে ফের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা।
খড়গপুর থেকে সৌমেন আদক এর রিপোর্ট , সানন্দা নিউজ

