
writing by – Sunipam Mahakul
Edited by – Sananda News
ইসকনের মিড-ডে মিল কি জঙ্গলমহলের শিশুদের পুষ্টির অভাবে মেটাবে?
ISKCON Mid Day Meal বিদুরের একমুঠো খুদেই তু্ষ্ট হয়েছিলেন ভগবান। কিন্তু খিদের পেটে ‘সাত্ত্বিক’ পুণ্য! ডিম-পেঁয়াজ ছাড়া ইসকনের মিড-ডে মিল কি জঙ্গলমহলের শিশুদের পুষ্টির অভাবে মেটাবে?
ISKCON Mid Day Meal পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ডিম হলো অত্যন্ত উচ্চমানের এবং সাশ্রয়ী একটি প্রাণিজ প্রোটিন। একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ৬.৩ গ্রাম প্রোটিন থাকে এবং মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড ডিমে বিদ্যমান থাকে।
ISKCON Mid Day Meal. ডিম-পেঁয়াজ ছাড়া মিড-ডে মিল
হাঁস, মুরগি, ডিম, আর সুযোগ পেলে মেটে আলু বা স্থানীয় শাকপাতা দিয়ে পেট ভরানো শবর, লোধা বা সাঁওতাল পরিবারের খুদে পড়ুয়াদের পাতে যদি হঠাৎ করে রাজমা, সয়াবিন আর পনিরের ‘সাত্ত্বিক’ আহার এসে পড়ে, তবে কেমন হবে? আর সেই আহারে যদি পেঁয়াজ-রসুনের কড়া ফোড়নটাই বেমালুম উধাও হয়ে যায়, তবে কি সেই খাবার তাদের মুখে রুচবে?
রাজ্য বাজেটে মিড-ডে মিল বা ‘পিএম পোষণ’ প্রকল্পের দায়িত্ব আংশিকভাবে ইসকনের হাতে তুলে দেওয়ার যে প্রস্তাব সরকার রেখেছে, তা নিয়েই এখন জঙ্গলমহলের অলিতে-গলিতে শুরু হয়েছে জোর তরজা।

কলকাতার কংক্রিটের জঙ্গলে মেগা-কিচেনের এই স্বয়ংক্রিয় সাত্ত্বিক মডেল হয়তো দারুণ হাততালি কুড়োবে, কিন্তু ঝাড়গ্রামের রুক্ষ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই মেনু-বদল আসলে প্রান্তিক সংস্কৃতির পাতে এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিচ্ছে।
ISKCON Mid Day Meal পুষ্টিবিজ্ঞান আর রাজনীতির এই অদ্ভূত ককটেলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিমোক্রেসি’।
ISKCON Mid Day Meal .শিক্ষক মশাইরা খুব ভালো করেই জানেন, সপ্তাহে যে দিনটাতে মিড-ডে মিলে একটা গোটা সেদ্ধ ডিম বরাদ্দ থাকে, সে দিন স্কুলের হাজিরা খাতাটা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ওই একটা ডিম স্রেফ প্রোটিনের ডেলা নয়, ওটা আসলে ঝাড়গ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের স্কুলমুখী করার সবচেয়ে বড় জাদুকঠি।
এখন প্রশ্ন হল, গোপীবল্লভপুর বা বেলপাহাড়ির যে শিশুটি বংশপরম্পরায় স্থানীয় আমিষ খাবার বা অন্তত পেঁয়াজ-রসুন দিয়ে রাঁধা তরকারি খেয়ে বড় হচ্ছে, তার পাতে এই সম্পূর্ণ অপরিচিত ‘পবিত্র’ নিরামিষ খাবার চাপিয়ে দেওয়াটা কি এক ধরনের সুপ্ত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নয়?

সমাজতাত্ত্বিকরা বলছেন, হাজার ক্যালোরির গাণিতিক অঙ্ক কষে ভিন রাজ্যের রাজমা বা পনির চাপিয়ে দিয়ে আসলে পরোক্ষভাবে জঙ্গলমহলের নিজস্ব খাদ্যাভ্যাসকেই ‘অশুদ্ধ’ বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
পাশের রাজ্য ঝাড়খণ্ড বা কর্ণাটকের দিকে তাকালেই এই ফাইভ-স্টার পুষ্টির আসল রূপটা পরিষ্কার হয়ে যায়। সেখানেও ইসকনের সহযোগী সংস্থা যখন পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া খাবার পরিবেশন শুরু করেছিল, তখন আদিবাসী শিশুরা সেই অচেনা স্বাদের খাবার সটান ডাস্টবিনে ফেলে দিতে শুরু করে।
ঝাড়গ্রামের ক্ষেত্রেও যে সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক মেগা-কিচেন বানিয়ে হয়তো ক্যালোরি মাপা খাবার দেওয়া যাবে, কিন্তু তার টানে বাচ্চারা যদি স্কুলেই না আসে, তবে সেই পুষ্টির অঙ্ক খাতায়-কলমেই থেকে যাবে।
ISKCON Mid Day Meal স্থানীয় অর্থনীতির প্রশ্ন
ISKCON Mid Day Meal এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় অর্থনীতির প্রশ্ন। এতকাল গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা এই রান্নার কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে দু’পয়সা রোজগার করতেন। সেন্ট্রাল কিচেন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এলে তাঁদের কাজ হারানোর আশঙ্কাও এই লাল মাটিতে নতুন করে ক্ষোভের আগুন জ্বালতে পারে।
ডিম বর্জনের সমালোচনার জবাবে ইসকনের মুখপাত্র রাধারমণ দাস দাবি করেছেন যে, ডিম বাদ গেলেও শিশুদের পুষ্টির কোনো ঘাটতি হবে না। ইসকনের নিজস্ব ডায়েটিশিয়ান এবং পুষ্টিবিদদের দ্বারা তৈরি খাদ্যতালিকায় সয়াবিন, পনির, রাজমা, কাবুলি চানা এবং বিভিন্ন প্রকারের ডাল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ডিমের সমতুল্য বা তার থেকেও উন্নত মানের প্রোটিন এবং ভিটামিন সরবরাহ করতে সক্ষম।

তিনি আরও যুক্তি দেন যে, বাঙালি খাবার মানেই শুধু মাছ-মাংস নয়; ডাল, সবজি এবং ভাত সমৃদ্ধ একটি নিরামিষ থালিও সম্পূর্ণ পুষ্টিকর হতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার বলতে প্রথমেই মায়ের হাতের রান্না
পুষ্টিকর খাবার বলতে প্রথমেই একজন মায়ের হাতের রান্নার কথা মনে আসে, এবং অন্নামৃত ঠিক সেই মাতৃস্নেহ ও ভক্তি নিয়েই শিশুদের খাবার পরিবেশন করার চেষ্টা করে। তারা এই খাবারকে শুধুমাত্র শারীরিক পুষ্টির মাধ্যম হিসেবে দেখে না; তাদের দাবি, একটি আধ্যাত্মিক পরিবেশে রান্না করা এই খাবার শিশুদের শরীর এবং আত্মা— উভয়কেই তৃপ্ত ও পুষ্ট করে।
যেহেতু ইসকন এই খাবার ভগবানকে নিবেদিত ‘ভোগ’ বা ‘প্রসাদ’ হিসেবে রান্না করে, তাই তারা অত্যন্ত যত্ন সহকারে সেরা ও বিশুদ্ধ উপকরণ ব্যবহার করার ওপর জোর দেয়। এই ভক্তি, পরিচ্ছন্নতা এবং স্নেহের ছোঁয়া শিশুদের মানসিক তৃপ্তি দিতে পারে এবং খাবারের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়াতে পারে, যা খাবারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক।
